‘সূত্রহীন’ মামলার রহস্য উদঘাটন করলো নাগরপুর থানা পুলিশ

মোঃ তোফাজ্জল হোসেন তুহিন, নাগরপুর (টাঙ্গাইল):

হত্যার মাত্র দুইমাস পর নাগরপুরে সূত্রহীন (ক্লু-লেস) বিপ্লব হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করার দাবি করেছে নাগরপুর থানা পুলিশ। হত্যাকান্ডে জড়িত প্রধান আসামীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
থানা পুলিশ জানায়, নিহত বিপ্লবের পিতা উজ্জল মিয়ার কাছে পাওনা টাকা চেয়ে না পেয়ে বিপ্লবকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যাক্তিরা হলেন ধুবড়িয়া গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে (১) সাগর (১৯), (২) একই গ্রামের মৃত মকুল মিয়ার ছেলে আশাদুল (২২), (৩) শেওরাইল গ্রামের আজমত মিয়ার ছেলে সানোয়ার (২৫), (৪) আলোকদিয়া গ্রামের আমির উদ্দিনের ছেলে মিন্নত (৪৫)। তাদের কাছ থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ১টি চাকু ও প্রধান আসামী সাগরের ব্যবহৃত শীতের কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে।
থানা পুলিশ জানায়, নিহত বিপ্লব ও তার পরিবার ঢাকায় বসবাস করে। বিজয় দিবস উদযাপন করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ১৫ ডিসেম্বর রবিবার গ্রামের বাড়িতে আসেন। নিহতের বাবা মাদক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়নাভুক্ত আসামী উজ্জল মিয়াকে নাগরপুর থানা পুলিশ গত ১৬ ডিসেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় কাঁচপাই মোড় থেকে গ্রেফতার করে। স্বামীর গ্রেফতারের খবর শুনে স্ত্রী বিথী ছেলে বিপ্লবকে বাড়িতে রেখে থানায় স্বামীকে দেখতে আসেন। বাড়ি ফিরে ছেলেকে দেখতে না পেয়ে সাম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেন। কিন্তু কোন সন্ধান পাননি। পরদিন সকালে তার স্বামীকে মুক্ত করার জন্য টাঙ্গাইল কোর্টে যান। কোর্টে থাকা অবস্থায় তিনি পরিজনের কাছে জানতে পারেন তার ছেলের গলাকাটা মরদেহ ধুবড়িয়া কুষ্টিয়া বিলের পাশে সরিষা ক্ষেতে মাঝে পরে আছে। কিন্তু কি কারণে এবং কারা তার সন্তানকে হত্যা করেছে ,সে সম্পর্কে কোন তথ্য জানাতে পারেননি তিনি। এ ঘটনায় নিহতের পিতা উজ্জল মিয়া (৩৮) জামিনে এসে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে নাগরপুর থানায় নিজে বাদী হয়ে মামলা করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোলাম মোস্তাফা মন্ডল বলেন, সূত্রহীন এ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে বিপ্লব হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য নিহতের গ্রামের বাড়ি ধুবরিয়ায় তদন্ত শুরু করি। পরে মামলায় নিয়োজিত গুপ্তচর ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে চৌকস একটি দল মামলার প্রধান আসামী সাগরকে মহাখালীর নাবিস্কো বিস্কিট ফ্যাক্টরী এলাকা থেকে আটক করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে রাসেল হত্যা মামলার রহস্য বেরিয়ে আসে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় আসামী সানোয়ারকে সাতক্ষীরা পাটকেল ঘাটা থানা ও তৃতীয় আসামী আশাদুল কে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। সন্দেহভাজন ও প্রথম আসামী সাগরের তথ্যানুযায়ী চতুর্থ আসামী মিন্নত কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য , নিহত বিপ্লবের বাবা মামলার বাদী মো.উজ্জল মিয়ার (৩৮) ঝুলন্ত মরদেহ গত ২৮ জানুয়ারী লক্ষীদিয়া গ্রামের শোভা মিয়ার মেহগনি বাগান থেকে উদ্ধার করে নাগরপুর থানা পুলিশ।
আটককৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, বিপ্লব হত্যামামলার আসামী চারজন মাদকাসক্ত। তারা নিহতের পিতা মৃত উজ্জল মিয়ার সাথে মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত। ধৃত আসামী গণ বিভিন্ন সময় উজ্জল মিয়ার সাথে মাদক ক্রয় করে সেবন ও ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে আর্থিক লেনদেন করে। কিন্তু নিহতের বাবা তাদেরকে মাদক সরবরাহ করতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাদের মাঝে মনমালিন্য দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তারা উজ্জল মিয়াকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর মাদক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়নাভুক্ত আসামী উজ্জল মিয়াকে সোমবার সন্ধ্যায় কাঁচপাই মোড় থেকে গ্রেফতার করে নাগরপুর থানা পুলিশ। এ ছাড়া উজ্জল মিয়ার সাথে প্রধান আসামী সাগরের পারিবারিক পূর্ব বিরোধ ছিলো। উজ্জল মিয়া পুলিশের কাছে গ্রেফতার হওয়ায় তাদের পরিকল্পনা নতসাৎ হয়ে যায়। পরে তারা মাদকাসক্ত বিপ্লবকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদক সেবনের কথা বলে তাকে স্থানীয় কুষ্টিয়া বিলের পাশে নিয়ে যায়। সাগর বিপ্লবের বাবার কাছে টাকা পাবে বলে বিপ্লবের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করে ও তাকে পেছন থেকে জাপটিয়ে ধরে ও ধারালো ছোড়া দিয়ে আঘাত করে। পরে অপর তিন আসামী শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করে বিপ্লবের মৃত্যু নিশ্চিত হলে পাশে সরিষা ক্ষেতে মরদেহ ফেলে চলে আসে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাগরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন, এটি একটি সূত্রহীন (ক্লু-লেস) মামলা। বাদীর ঝুলন্ত মরদেহ পুলিশ উদ্ধার করার পর আমরা কিছুটা হলেও তদন্তে বাধাগ্রস্থ হই। তবে আমরা হতাশ হইনি । আমাদের দক্ষ অফিসারগণ দিনরাত পরিশ্রম করে সাভার, মহাখালি ও ঢাকার আনাচে কানাচে অভিযান চালিয়ে মামলার প্রধান আসামী সাগরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছেন। আসামীগণ বিজ্ঞ আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করে জবান বন্দি দিয়েছে।

পাঠকের মতামত

আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

আমাদের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ