যেভাবে অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ

বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশ। তৃণমূল থেকে সংগৃহীত তথ্য বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো হয়। ওইসব তথ্য ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট শাখায় নথিভুক্ত করার পর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, গোয়েন্দা ইউনিটগুলোতো আছেই, অন্যান্য মাধ্যমেও অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশ ও বিট পুলিশিং ব্যবস্থা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) প্লাটফর্ম ব্যবহার করেও ভার্চুয়াল জগতের অপরাধ ও অপরাধী সম্পর্কে প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে থাকে পুলিশ।

যুদ্ধাপরাধী, শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও পলাতক আসামিদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়, জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট শাখার কোনও কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। বিষয়টি গোপনীয় উল্লেখ করে এ বিষয়ে তথ্য দিতেও রাজি হননি তারা। তবে কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রচলিত নিয়ম হচ্ছে, সোর্স কিংবা গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সেই তথ্য সংগ্রহেও নতুনভাবে এগুচ্ছে পুলিশ সদর দফতর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ছাড়াও যেসব অ্যাপে মানুষ যোগাযোগ করে থাকে, সেগুলোতেও নজরদারি করা হয়। কারণ, জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা এখন ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমেই নিজেদের মধ্যে বেশি যোগাযোগ করে থাকে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) অপরাধ সংঘটনে প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধে কাজ করছে। এরমাধ্যমেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের তথ্য পেয়ে থাকে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো।

পুলিশ সদর দফতরের কমিউনিটি পুলিশিং শাখার এআইজি সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘অপরাধীর তথ্য সংগ্রহে পুলিশের প্রধান সোর্স হয়ে উঠেছে কমিউনিটি পুলিশিং। কারণ, আমাদের এই কমিউনিটির মধ্যেই যেহেতু অপরাধীরা থাকে, তাই কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্যরা অপরাধীদের খবরটা আগে পান। তখন তাদের কাজ হচ্ছে থানা পুলিশকে অবগত করানো যে, এখানে এ ধরনের অপরাধী আছে, কিংবা অপরাধের আলামত দেখা যাচ্ছে। এরপর পুলিশ তাৎক্ষণিক  সেই অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে। ভবিষ্যতের জন্য আরও  কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গ্রামে ও এলাকায় ৮-১০ জনের টিম করে রাতে পাহারা ও সোর্স নিয়োগের মাধ্যমে অপরাধ ও অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। জঙ্গিবাদ বা ধর্মীয় গোড়ামী নিয়ে কেউ অপব্যাখ্যা করছেন কিনা, বিতর্কিত ফতোয়া, হিল্লা ও বাল্য বিয়েসহ নানা অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও চোরাচালানি, মানব পাচারকারী, খাদ্যে ভেজালকারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও জনমত সৃষ্টিতে কাজ করবে কমিউনিটি পুলিশিং।

একই উদ্দেশ্যে নিজ উদ্যোগে পুলিশের সিলেট রেঞ্জে বছর দু’য়েক আগে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন ডিআইজি কামরুল আহসান। যে কারণে গত পুলিশ সপ্তাহে তাকে পদকও দেওয়া হয়েছিল। কামরুল আহসান বলেন, ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের এই যুগে বাংলাদেশে যেন তৃণমূলে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দানা বেঁধে উঠতে না পারে, সেজন্য পুলিশ সদর দফতর থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সদর দফতরের অনুমতি নিয়েই সেসব উদ্যোগকে কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে মানুষকে নিরাপদ রাখার জন্য এলাকাভিত্তিক আমরা কাজ করে যাচ্ছি। শুধু সিলেট অঞ্চলেই নয়, সারাদেশের পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।’

কামরুল আহসান জানান, বিট পুলিশিংয়ের ধারণাটা প্রথমে ছিল শহরকেন্দ্রিক। পরে পিআরবি প্রবিধান ৬৫৬ অনুযায়ী সিলেট অঞ্চলের সব জেলা ও পৌর শহর, ইউনিয়নের ওয়ার্ড-ভিত্তিক বিট পুলিশিং গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে বিট পুলিশিংয়ের আওতায় প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লাকেও নিয়ে আসা হয়। এর ব্যাপক সুফল পাওয়া যায়। পরে এ পদ্ধতি গ্রহণ করেন অন্যান্য এলাকার পুলিশ কর্মকর্তারাও।

বিট পুলিশিংয়ের দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তার এলাকার ম্যাপ তৈরির জন্য। এরপর তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় বিটের আওতাধীন জিআর ও সিআর মামলা এবং ওয়ারেন্ট ও সাজার তালিকা তৈরি, বিভিন্ন পেশার কমপক্ষে ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বিটের আওতাধীন শীর্ষ ১০ সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করার জন্য। এছাড়াও এলাকার ভাড়াটিয়াদের তালিকা, কেয়ার টেকারের তত্ত্বাবধানে থাকা বাসা বাড়ির তথ্য সংগ্রহ, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দিরের প্রধানদের তালিকা করা। বহিরাগত লোকদের তথ্যসহ এলাকার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অগ্রিম গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, ‘এভাবেই সারাদেশ থেকে এখন অপরাধ ও অপরাধীর তথ্য সংগ্রহ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সতন্ত্র সংস্থা হচ্ছে টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)। সংস্থাটির প্রধান হচ্ছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী অবাধ তথ্য প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার ফলে অপরাধ কার্যক্রমে প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। এনটিএমসির প্লাটফর্ম ব্যবহার করে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাকে সন্ত্রাসীদের তথ্য ও প্রযুক্তিগত সব সহায়তা দিচ্ছে থাকে এনটিএমসি।

 

পাঠকের মতামত

আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

আমাদের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ