পর্যটক ও গবেষকদের নতুন আকর্ষণ লংলা সিমেট্টি

প্রকৃতির লীলা ভূমি চা-কন্যার দেশে চির নীদ্রায় শায়িত ট্রি প্লান্টারদের “সিমেট্টি” গবেষক পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ। সমাধীতে মূল্যবান জিনিসপত্রের লোভে চোরদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে ট্রি প্লান্টারদের সিমেট্টি।

কালের বিবর্তনে চা শিল্পের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে চা শিল্প বিপ্লবীদের নাম পরিচয়। পর্যটন নগরী হিসাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত মৌলভীবাজারে রয়েছে চা নগরের প্রাকৃতিক জীব বৈচিত্রের নানা গল্প কাহিনী। তেমনি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের ডানকান ব্রাদার্সের লংলা চা বাগানে কালের স্বাক্ষী হয়ে চা শিল্পে অবদান রাখা ব্রিটিশ নাগরিক ট্রি প্লান্টার ও তাঁর পরিবারের সিমেট্টি।

সারা দেশে এমন চারটি সিমেট্টি থাকলেও লংলা চা বাগানের সিমেট্টি পর্যটক ও গবেষকদের জন্য এখন নতুন আর্কষণ। চারিদিকে চা পাতার সুগন্ধ আর রাবার গাছের সারি সারি আঁকা বাঁকা পথ পর্যটকদের উতালা করে তুলে। শুধু সিমেট্টি নয় লংলা চা বাগানে রয়েছে একটি লেক যা টিলার ভিতর এক টুকরো আঁকা বাঁকা জলপথ। পাশেই রয়েছে লাল টিলা। লাল পাহাড় দেখার জন্য আর রাঙামাটি যেতে হবে না। বিশাল লাল টিলার উপর দাঁড়ালে মনে হয় এই বুঝি আঁকাশ ছুই ছুই। শুধু চোখ দিয়ে দেখা ছাড়া কথা বলার প্রয়োজন নেই। লংলার প্রকৃতিকে দেখে ঘুরতে আসা অনেকেই বলেছেন একের ভিতর এত সুন্দর্য আর কোথাও এক সাথে দেখতে পাইনি।

১৮৫৭ সালে মালনী ছড়া চা বাগান স্থাপনের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে চা বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে। তেমনি ১৮৮০ সনে মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে চা চাষাবাদ করা শুরু হয়। ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশদের শাষনে থাকায় ব্রিটিশরা তাদের স্বদেশী ট্রি প্লান্টারদের ভারত উপমহাদেশে নিয়ে আসে চা শিল্পের বিস্তার করার জন্য। বয়স, বিভিন্ন রোগ ও অসুস্থতার কারণে ট্রি প্লান্টাররা মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়াও সারা দেশের মধ্যে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, শ্রীমঙ্গল, লংলা চা বাগানে এই সব ট্রি প্লান্টারদের সিমেট্টি রয়েছে। তাঁর মধ্যে ২৮জনকে লংলা সিমেট্টিতে সমাহিত করা হয়।
কথিত আছে খ্রীষ্টীয় ধর্মের রীতি অনুযায়ী কেহ মারা গেলে তাঁর মূল্যবান ব্যবহীত জিনিসপত্র স্বর্ণ অলংকার তাঁর সমাধীস্থলে রেখে দেওয়া হয়। তাই এইসব মূল্যবান জিনিসপত্রের লোভে অজ্ঞাত চোরেরা সমাধীস্থল ভেঙে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করছে। দুটি শিশুর সমাধীস্থলের মূল্যবান কষ্টিপাথরের যীশু খ্রীষ্টের ভার্ষ্কযের অর্ধেক ভেঙে নিয়ে গেছে।

এছাড়াও সমাধীস্থলের মূল্যবান কষ্টিপাথর লাগানো থাকায় কষ্টিপাথরের লোভে সমাধী ভেঙে ফেলছে। যার ফলে অনেক ট্রি প্লান্টারদের নাম পরিচয় মুছে গেছে। ফলে লংলা চা বাগানের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে। যা শুধু লংলা চা বাগানের জন্য নয় সারা দেশের ক্ষতি হচ্ছে। এই সিমেট্টিগুলো পর্যটকদের আর্কষণ করার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। চায়ের ইতিহাস থেকে মুছে যাচ্ছে ট্রি প্লান্টারদের সমাধী। চা শিল্পের বিপ্লব ঘটাতে স্বদেশ ছেড়ে চা উৎপাদনে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন এই সব ব্রিটিশ নাগরিক।

সিমেট্টি, লেক, লাল টিলা দেখতে আসা হাফিজুর রহমান নোমান বলেন, বাড়ির পাশে এত সব থাকতে অনেক আর্কষণীয় স্থান দেখতে গিয়েছি কিন্তু এই প্রথম বার নিজ এলাকার সৌন্দর্য দেখে মনে হলো দেশের সবচেয়ে সুন্দর স্থান। যা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।

পরিবেশ কর্মী এইচ কে সালমান বলেন, আমরা কাছের সৌন্দর্যটুকু দেখিনা। কিন্তু একবার লংলা চা বাগানে গেলে বুঝা যায় দেশের সুন্দর স্থানের মধ্যে এটা অন্যতম স্থান।
ঘুরতে আসা রুজি আক্তার পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, আমাদের জেলায় এত সৌন্দর্যের লীলা ভূমি লংলা চা বাগান না আসলে বুঝতেই পারতাম না। আমার মনে হয় প্রাকৃতিক সুন্দর্যে ভরা আর ট্রি প্লান্টারদের সমাধী, লেক, লাল টিলা একি সাথে এত বৈচিত্রময় পরিবেশ আর কোথাও নেই। সত্যি এত নিরিবিলি এলাকা আর দেখিনি। এছাড়াও দেড়শত বর্ষের পুরাতন চায়ের গাছ এখনো জীবিত রয়েছে দেখে নিজের কাছে খুবই আশ্চর্য্য হয়েছি।

সংশ্লিষ্ট বাগান কর্তৃপক্ষ শায়িতদের পরিচিতি তাদের সমাধীতে স্থাপন করলে পর্যটক-সহ ভবিষ্যত প্রজন্ম জানতে পারবে চায়ের বিপ্লবে বিলিয়ে দেওয়া মানুষগুলোর ইতিহাস।

পাঠকের মতামত

আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

আমাদের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ