জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত হচ্ছে, মৃত্যুনিবন্ধনে গড়িমসি

জীবনের নানা অধিকার নিশ্চিতে জন্মনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক হওয়ায় সদ্যোজাতদের জন্মনিবন্ধনে যতটা উৎসাহ, ‘প্রয়োজন না হওয়ায়’ মৃত্যুনিবন্ধনে ঠিক ততটাই গড়িমসি দেখা যায়। কেবল সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারার বিষয় থাকলেই মৃত্যুনিবন্ধনে নাগরিকদের আগ্রহ। প্রকল্পের নাম জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন হলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জন্মনিবন্ধন নিয়ে যত তোড়জোড়, মৃত্যুনিবন্ধন নিয়ে ঠিক ততটা নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শতভাগ মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত সম্ভব হয়নি, তবে চেষ্টা চলছে। আর প্রকল্পের শুরু যার হাত দিয়ে সেই প্রকল্প পরিচালক বলছেন, মৃত্যুনিবন্ধনের জন্য জন্মনিবন্ধন থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে বয়স্করা জন্মনিবন্ধন না নেওয়ায় পরবর্তীতে মৃত্যুনিবন্ধন করছেন না। তিনি বলেন, কিছু ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে অসদুপায় অবলম্বন করতে বরাবরই দেখা যায়। এখনই সেটা বন্ধ না করলে এই বিশাল ডাটা পরে আর কোনও কাজে লাগবে না।

নাগরিকদের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০০৪ সালে বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যুনিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে আইন পাস করা হয়। এরপর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় ২০০৬ সালে। দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে মরণশীলতা (মৃত্যু হার) প্রতি হাজার জনসংখ্যায় ৫ জন, যা পল্লি এলাকায় ৫.৪ জন এবং শহর এলাকায় ৪.৪ জন। ২০১৪ সালে এই হার ছিল ৫.২। শিশু মৃত্যুর হারের ক্ষেত্রে (এক বছরের নিচে) একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। শিশু মৃত্যু হার ২০১৪ সালে প্রতি হাজার শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে ছিল ৩০, এই হার ২০১৮ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২২-এ। কিন্তু, ঠিক কতজনের মৃত্যু নিবন্ধিত হয়েছে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি প্রকল্পের কর্মকর্তারা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৬ কোটি ৯৩ লাখ ঊনপঞ্চাশ হাজার ১৬৩ জনের জন্মনিবন্ধন হয়েছে। আর নিবন্ধিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৩ লাখ ১ হাজার ৫৭৮। এই সংখ্যা ঠিক কত শতাংশ মৃত্যুকে উল্লেখ করতে সক্ষম প্রশ্নে প্রকল্পের অতিরিক্ত সচিব মাণিক লাল বণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা কেবল সংখ্যাটাই বলতে পারি। তবে শতভাগ মৃত্যুনিবন্ধন সম্ভব হয়নি।

কেন শতভাগ মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত করা গেল না প্রশ্নে সাবেক পরিচালক আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১৮টি জায়গায় জীবনের নানা সময়ে আপনার এই জন্মনিবন্ধন দরকার হবে। আর মৃত্যুনিবন্ধন কেবল চারটি ক্ষেত্রে দরকার হয়। ফলে মানুষের উৎসাহ কম। আর জন্মনিবন্ধনের ওপর স্কুলে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির বয়স সব জায়গায় দরকার হওয়ায় একাধিকবার জন্মনিবন্ধন করতেও নানা ফাঁকফোকর খোঁজা হয়।

এক ব্যক্তি একাধিক নিবন্ধন করতে পারে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, আইনে আছে সনদ একাধিক জায়গা থেকে নেওয়া যাবে। ফলে নানা চাতুরির সুযোগ আছে। আবার সন্তানের জন্মের পরপরই নিবন্ধনের কথা বলা থাকলেও বয়স লুকাতে নিবন্ধন পরে করার মতো ঘটনাও আছে। এসব অসততার কারণে আমাদের এই বিশাল ডাটা কালেকশন একসময় কোনও কাজেই আসবে না।

জন্মনিবন্ধন অধিকার আইনগত সুরক্ষা এবং জন্মের পরপরই নিবন্ধন করাতে হয় বলে এদিকে মনোযোগ বেশি উল্লেখ করে প্রকল্পের অতিরিক্ত সচিব মাণিক লাল বণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি শিশু পৃথিবীতে এসেছে, পিতামাতা তাকে লালনপালন করবে, সে দেশের নাগরিক হবে, ফলে নিবন্ধন জরুরি। নাগরিক যেকোনও সুবিধা ভোগের জন্য বাধ্যতামূলক করায় দেশবাসী এটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিয়েছে। আর তার পেনশন, বিমার দাবি, জমি মিউটেশনের জন্য মৃত্যুনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায় এসব বিষয় না থাকলে পরিবার মৃত্যুনিবন্ধন করানোয় সতর্ক থাকে না। যদিও আগের পরিচালক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, যারা নিবন্ধনের কাজটি করেন তাদের চাকরিজীবী হিসেবে না নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে রাখা হয়েছে এবং আর্থিক সুবিধা না থাকায় তাদের গাছাড়া ভাব আছে। মৃত্যুনিবন্ধনের সংখ্যা কম হওয়ার কারণ বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ভুলে গেলে মৃত্যুনিবন্ধন করতে গেলেও জন্মনিবন্ধন লাগবে। যার জন্মনিবন্ধন নেই তিনি মৃত্যুনিবন্ধন করতে পারছেন না।

 

পাঠকের মতামত

আরো খবর

ফেসবুকে আমরা

আমাদের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ